বংশগতির আনবিক ভিত্তি: DNA, জিন, ক্রোমোজোম ও প্রোটিনের ভূমিকা | Molecular Basis of Heredity in Bengali

বংশগতির আনবিক ভিত্তি: DNA, জিন, ক্রোমোজোম ও প্রোটিনের ভূমিকা | Molecular Basis of Heredity in Bengali


বংশগতির আনবিক ভিত্তি

ভূমিকা

জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হলো—কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বৈশিষ্ট্য স্থানান্তরিত হয়? কেন সন্তান তার বাবা-মায়ের মতো দেখতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে আলাদা বৈশিষ্ট্যও ধারণ করে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে জীবদেহের ভেতর এক বিশেষ অণু রয়েছে, যেটি বংশগত তথ্য বহন করে। সেই অণুটি হলো ডিএনএ (DNA)। ডিএনএ-ই জীবনের নকশা বহন করে, আর এর মাধ্যমেই বংশগতি গঠিত হয়।

অতএব, বংশগতির আনবিক ভিত্তি বলতে বোঝায়—ডিএনএ, আরএনএ, জিন ও প্রোটিনের মতো অণুর কার্যপদ্ধতি যার মাধ্যমে বংশগত তথ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়।


বংশগতির বাহক: জিন ও ক্রোমোজোম

  • জিন (Gene): জিন হলো বংশগতির মৌলিক একক। এটি ডিএনএ-র একটি নির্দিষ্ট অংশ যা কোনো বিশেষ প্রোটিন তৈরির নির্দেশ বহন করে।
  • ক্রোমোজোম (Chromosome): ডিএনএ প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে। মানুষের প্রতিটি কোষে ৪৬টি ক্রোমোজোম (২৩ জোড়া) থাকে।
  • ডিএনএ (DNA): ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো দীর্ঘ দ্বিসুত্রক অণু, যেখানে বংশগত তথ্য কোড আকারে লেখা থাকে।


ডিএনএ-র গঠন (Structure of DNA)

জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিক ১৯৫৩ সালে ডিএনএ-র দ্বিসুত্রক (Double Helix) গঠন আবিষ্কার করেন।

প্রধান বৈশিষ্ট্য

  1. ডিএনএ দুটি দীর্ঘ সুতা দ্বারা তৈরি, যেগুলি পরস্পরের চারপাশে পাক খেয়ে দ্বিস্পাইরাল তৈরি করে।

  2. প্রতিটি সুতার মূল একক হলো নিউক্লিওটাইড, যা গঠিত –

    • ফসফেট গ্রুপ

    • ডিঅক্সিরাইবোজ সুগার

    • নাইট্রোজেনযুক্ত ক্ষারক (A, T, G, C)

  3. ক্ষারকগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট জোড়া বাঁধন হয় –

    • অ্যাডেনিন (A) ↔ থাইমিন (T)

    • গুয়ানিন (G) ↔ সাইটোসিন (C)

  4. এই ক্ষারকগুলির বিন্যাসই হলো জিনগত কোড


ডিএনএ প্রতিলিপি (Replication of DNA)

প্রতিটি কোষ বিভাজনের আগে ডিএনএ নিজের একটি কপি তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় DNA Replication

  • ডিএনএ হেলিকেজ (Helicase) এনজাইম সুতাকে আলাদা করে।
  • ডিএনএ পলিমারেজ (Polymerase) নতুন নিউক্লিওটাইড বসিয়ে নতুন সুতার সৃষ্টি করে।
  • এর ফলে প্রতিটি নতুন কোষে সমান ডিএনএ পৌঁছে যায়।

এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বংশগত তথ্য হুবহু স্থানান্তরিত হয়।


আরএনএ ও প্রোটিন সংশ্লেষণ

ডিএনএ-তে লেখা বংশগত তথ্য কীভাবে প্রকাশ পায়? এর উত্তর হলো—DNA → RNA → Protein। এটিই Central Dogma of Molecular Biology নামে পরিচিত।

  1. ট্রান্সক্রিপশন (Transcription): ডিএনএ থেকে তথ্য কপি করে আরএনএ (RNA) তৈরি হয়।
  2. ট্রান্সলেশন (Translation): আরএনএ থেকে অ্যামিনো অ্যাসিড সাজিয়ে প্রোটিন তৈরি হয়।
  3. প্রোটিনের ভূমিকা: জীবদেহের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য—চুলের রঙ, চোখের রঙ, উচ্চতা ইত্যাদি—মূলত প্রোটিনের গঠন ও কার্যকারিতার উপর নির্ভর করে।


জেনেটিক কোড (Genetic Code)

  • তিনটি ক্ষারকের একটি সেট (Codon) একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড নির্দেশ করে।
  • উদাহরণ: AUG → মিথিওনিন অ্যামিনো অ্যাসিড।
  • এই কোড সর্বজনীন (Universal), অর্থাৎ সব জীবেই একই রকম কাজ করে।


বংশগতির আনবিক প্রমাণ

  1. গ্রিফিথের পরীক্ষা (1928): ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে "Transforming Principle" এর প্রমাণ দেন।
  2. অ্যাভেরি, ম্যাকলিওড ও ম্যাককার্টি (1944): প্রমাণ করেন, Transforming Principle আসলে DNA।
  3. হার্শি-চেজ পরীক্ষা (1952): ভাইরাসে ডিএনএ-ই বংশগতির মূল বাহক তা নিশ্চিত করেন।


বিভেদ ও ডিএনএ

বংশগতির পাশাপাশি বিভেদ বা Variation-এরও আনবিক ভিত্তি রয়েছে।

  • Mutation (আকস্মিক পরিবর্তন): ডিএনএ-র ক্ষারক বিন্যাসে পরিবর্তন হলে নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়।
  • Recombination: প্রজননের সময় ক্রোমোজোমগুলির মধ্যে জিনের বিনিময় ঘটে।
  • Crossing Over: মিয়োসিসে জিন বিনিময়ের ফলে বিভেদ সৃষ্টি হয়।


বংশগতির আনবিক ভিত্তির গুরুত্ব

১. জীববিজ্ঞানে

  • প্রজাতির বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়।
  • বিবর্তনের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়।

২. চিকিৎসা বিজ্ঞানে

  • জেনেটিক রোগের কারণ খুঁজে পাওয়া যায় (যেমন থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া)।
  • জিন থেরাপি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সম্ভব হয়েছে।

৩. কৃষি ও পশুপালনে

  • উন্নত জাতের গাছ ও পশু তৈরি করা যায়।
  • রোগ প্রতিরোধী ফসল উৎপাদন সম্ভব।

৪. প্রযুক্তিতে

  • DNA Fingerprinting অপরাধ তদন্তে ব্যবহৃত হয়।
  • ক্লোনিং প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়েছে।


উপসংহার

বংশগতির আনবিক ভিত্তি হলো জীববিজ্ঞানের আধুনিক যুগের অন্যতম বিস্ময়কর আবিষ্কার। DNA নামক ক্ষুদ্র অণুর মধ্যেই জীবনের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। DNA-ই আমাদের বৈশিষ্ট্য বহন করে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত করে এবং বিভেদের মাধ্যমে নতুনত্ব সৃষ্টি করে।

আজকের চিকিৎসা, কৃষি, প্রযুক্তি, এমনকি মহাকাশ গবেষণাতেও DNA ও জিনগত গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই বলা যায়—বংশগতির আনবিক ভিত্তি শুধু জীববিজ্ঞানের নয়, মানব সভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম স্তম্ভ।




বংশগতি ও বিভেদ: সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, উদাহরণ ও গুরুত্ব | Heredity and Variation in Bengali



----------------------------------------------------------------------------------------------------

বংশগতির আনবিক ভিত্তি
DNA এবং বংশগতি
Molecular basis of heredity
জিন ও ক্রোমোজোম
বংশগতি ও বিভেদ
Genetics in Bengali
HS Biology Notes
Madhyamik Life Science Notes
মলিকিউলার বায়োলজি

Mendel’s Law and DNA

Post a Comment

We’d love to hear your thoughts! Share your comment below.

Previous Post Next Post